
নিজস্ব প্রতিবেদক | গাজীপুর–সাভার | দৈনিক আশুলিয়া
গাজীপুরের কোনাবাড়ীর নীলনগরে শতভাগ রপ্তানিমুখী মুকুল নিটওয়্যার লিমিটেডের বন্ধ হয়ে যাওয়া যেন গোটা শিল্পাঞ্চলের বর্তমান চিত্রের প্রতিচ্ছবি। একসময় যেখানে তিন হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন, সেখানে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬৭০ জন শ্রমিক নিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছিলেন মালিকপক্ষ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রয়াদেশ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ধাক্কায় শেষ পর্যন্ত ১৭ ডিসেম্বর স্থায়ীভাবে কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কারখানাটির কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর মো. শরিফ হোসেন জানান,
“কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২৮০ জন পুরুষ ও ৩৯০ জন নারী শ্রমিক একসঙ্গে বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকের সংসার এখন চরম অনিশ্চয়তায়।”
শিল্প পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৩২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
গাজীপুরে বন্ধ ১৮৮টি কারখানা
সাভার ও আশুলিয়ায় বন্ধ ১৩৯টি কারখানা
এতে বেকার হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার শ্রমিক, যার মধ্যে শুধু গাজীপুরেই বেকার হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ।
বন্ধ হওয়া কারখানার তালিকায় রয়েছে—
বেক্সিমকোর ১৩টি ইউনিট, ডার্ড কম্পোজিট, সিজন ড্রেসেস, পলিকন লিমিটেড, টেক্সটাইল ফ্যাশন, লা-মুনি অ্যাপারেলস, নাসা গ্রুপের লিজ ফ্যাশন, মিককিফ অ্যাপারেলস, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকসহ বহু নামকরা প্রতিষ্ঠান।
বন্ধ লিজ অ্যাপারেলসের সাবেক সুপারভাইজার রুস্তম আলী বলেন,
“নিয়মিত বেতন পেতাম, সম্মান নিয়ে কাজ করতাম। এখন কারখানা বন্ধ। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।”
অনেক শ্রমিক এখন রিকশা চালাচ্ছেন, দিনমজুরি করছেন, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। আবার কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
কাশিমপুর এলাকার বাড়িওয়ালা ইদ্রিস মোল্লা বলেন,
“বেক্সিমকোর শ্রমিকদের ভাড়ায় আমাদের সংসার চলত। এখন ঘর ফাঁকা পড়ে আছে। ব্যাংক ঋণ শোধ করতে পারছি না।”
একই চিত্র আশুলিয়া ও সাভার এলাকাজুড়ে। দোকানপাটে বিক্রি কমে গেছে ৬০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন,
“জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্ডার কমে যাওয়া এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে।”
সাভার-আশুলিয়া শিল্প পুলিশের এসপি মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান,
“শুধু গত দেড় বছরে ১৩৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। অধিকাংশ শ্রমিক এখন বেকার।”
গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন,
“কাজ না পেয়ে অনেক শ্রমিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটি সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে।”
আশুলিয়ার শ্রমিক আলেয়া আক্তার বলেন,
“চার মাস ধরে বেকার। স্বামী কখনো রিকশা চালায়, কখনো দিনমজুরি করে। সংসার চালানো দায় হয়ে গেছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত শিল্প খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে—
শ্রমিক বেকারত্ব আরও বাড়বে
সামাজিক অপরাধ বাড়বে
আবাসন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ধসে পড়বে
রপ্তানি খাত চরম সংকটে পড়বে
তাদের মতে, সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে
✔ ব্যাংকিং সহায়তা
✔ কর রেয়াত
✔ বিদ্যুৎ–গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত
✔ শ্রমিক পুনর্বাসন কর্মসূচি
গ্রহণ করতে হবে।
📌 সংক্ষেপে চিত্র:
বন্ধ কারখানা: ৩২৭টি
বেকার শ্রমিক: প্রায় ১.৫ লাখ
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা: গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া
মূল কারণ: অর্থনৈতিক সংকট, অর্ডার কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ এস এম নজরুল ইসলাম অফিসঃ ৫৬/৫৭ শরীফ ম্যানশন(৪র্থ তলা) মতিঝিল কমার্সিয়াল এলাকা,ঢাকা-১০০০ মোবাইলঃ ০১৭১৪-৩৪০৪১৭ ইমেইলঃ kazialamin577@gmail@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আশুলিয়া. All rights reserved.