দৈনিক আশুলিয়া
প্রকাশিত: বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
প্রতিবেদক: মোঃআল আমিন কাজী
ঢাকা: নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া জনবান্ধব অঙ্গীকার পূরণে কাজ শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিপুল অর্থ, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাজস্ব আয়ের শ্লথগতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠোর শর্ত পূরণের চাপ—সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেট প্রণয়নে সরকার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঘাটতি বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার আট লাখ ৪৮ হাজার থেকে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ধরা হচ্ছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত হয়ে দাঁড়িয়েছে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেট ছিল সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে আগামী অর্থবছরে এই ঘাটতি দুই লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হবে।
রাজস্ব আয়ের গতি কম থাকায় বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
এই সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। কিন্তু তিনটি প্রধান খাতে মোট রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা।
সরকার আগামী ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কার্ডধারী পরিবারগুলোকে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে।
এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, “রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আগামী বাজেটের অর্থায়ন অত্যন্ত কঠিন হবে। সরকারি বেতন বৃদ্ধি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি ও আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “রাজস্ব আয় না বাড়লে ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বিদেশি ঋণ বা মুদ্রা ছাপানোর পথে যেতে হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।”
আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ভর্তুকি কমানো, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং বিদ্যুৎ খাতে মূল্য সমন্বয়সহ বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে।
বিশেষ করে ভর্তুকি কমানোর শর্তের কারণে নতুন পে-স্কেল বা কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ব্যবসায়ীদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগ কমে গেছে এবং শিল্পখাতে কাঁচামাল আমদানিও হ্রাস পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, করদাতা ও অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে প্রাক-বাজেট প্রস্তাব আহ্বান করেছে। আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের মাধ্যমে এসব প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “আমরা গতানুগতিক বাজেট করতে চাই না। এমন বাজেট করতে চাই যেখানে জনগণ অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে এবং উন্নয়নের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর ব্যয়-নিয়ন্ত্রণ, কাঠামোগত সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ এস এম নজরুল ইসলাম অফিসঃ ৫৬/৫৭ শরীফ ম্যানশন(৪র্থ তলা) মতিঝিল কমার্সিয়াল এলাকা,ঢাকা-১০০০ মোবাইলঃ ০১৭১৪-৩৪০৪১৭ ইমেইলঃ kazialamin577@gmail@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আশুলিয়া. All rights reserved.