সম্পাদকীয় | দৈনিক আশুলিয়া
শীত প্রকৃতির এক অনিবার্য ঋতু। কারও কাছে এটি আরাম ও উপভোগের সময় হলেও সমাজের এক বিশাল অংশের জন্য শীত মানেই কষ্ট, অনিশ্চয়তা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম। হিমেল বাতাস, কনকনে ঠান্ডা, উষ্ণ পোশাক ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব—সব মিলিয়ে শীত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জীবনে এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে দেখা দেয়।
শহরের ফুটপাত, বস্তি কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের কুঁড়েঘরে বসবাসকারী মানুষদের কাছে শীতবস্ত্র কোনো সাধারণ প্রয়োজন নয়, বরং তা অনেক সময় অধরা স্বপ্ন। রিকশাচালক, দিনমজুর, পথশিশু, বৃদ্ধ-বিধবা ও ছিন্নমূল মানুষদের শরীরে থাকে মাত্র একটি পাতলা কাপড়। শীতের রাতে উষ্ণ ঘরের নিরাপত্তা ও আরাম তাদের ভাগ্যে জোটে না। ফলে শীতজনিত রোগ—সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট—নিয়মিত সঙ্গী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এই সময়টি হয়ে ওঠে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় মানবতার ভূমিকা অনস্বীকার্য। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো দয়া নয়; এটি মানুষের প্রতি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। মানবতা কেবল অনুভূতির বিষয় নয়, এটি কর্মে প্রকাশ পায়। একটি কম্বল, একটি সোয়েটার কিংবা সামান্য উষ্ণ খাবার—যা আমাদের কাছে তুচ্ছ—তা কারও জীবনে হতে পারে অমূল্য আশীর্বাদ।
মানবতার শিক্ষা সব ধর্ম ও নৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি। ইসলামসহ সব ধর্মেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে সর্বোচ্চ মানবিক গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অভাবীর সাহায্য শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি আত্মিক পরিশুদ্ধতার পথও। যে সমাজে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, সেই সমাজই মানবিক, শান্তিপূর্ণ ও শক্তিশালী।
শীতার্তদের দুর্ভোগ লাঘবে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। ব্যক্তি পর্যায়ে অতিরিক্ত শীতবস্ত্র দান, পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে সহমর্মিতা, সামাজিক ও যুব সংগঠনের মাধ্যমে শীতবস্ত্র সংগ্রহ ও বিতরণ, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ—সবকিছু মিলেই বড় পরিবর্তন সম্ভব। একই সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ, সঠিক বণ্টন ও কার্যকর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।
শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ালে শুধু জীবন রক্ষা হয় না; সমাজে মানবিক বন্ধন দৃঢ় হয়, মানসিক প্রশান্তি আসে এবং অন্যদের মাঝেও সহমর্মিতার অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে পড়ে। তবে সাহায্যের ক্ষেত্রে মানবিক মর্যাদা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দান যেন কখনোই অপমানের কারণ না হয়—সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গেই সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।
শীত আমাদের জন্য ঋতুবদলের বার্তা, কিন্তু শীতার্ত মানুষের জন্য এটি বেঁচে থাকার কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় মানবতার আলো জ্বালানোই আমাদের দায়িত্ব। আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সামান্য সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। কারণ মানবতার হাতই সবচেয়ে বড় শক্তি—যা শীতের কনকনে ঠান্ডাকেও উষ্ণতায় রূপ দিতে পারে।
শীতার্তের পাশে থাকুক মানবতার হাত—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

