দৈনিক আশুলিয়া
প্রকাশ: ১২:১৯, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আসন্ন নতুন সরকারের দিকে আশাবাদ নিয়ে তাকিয়ে আছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তাদের বিশ্বাস, চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির সামনে থাকা জ্বালানি সংকট, ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, একটি স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা এবং বিদেশি ক্রেতাদের সতর্ক অবস্থানের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা করছেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, নতুন সরকারের নেতৃত্বে সংসদ শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বস্ত্র খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআই সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, বাণিজ্য সংগঠনগুলোকে সরকারের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হচ্ছে, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শওকত আজিজ রাসেল অভিযোগ করেন, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৩ শতাংশ অবদান রাখা বস্ত্র খাতের প্রতিনিধিরা গত ১৮ মাসে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার সুযোগ পাননি। একই সময়ে কিছু দুর্বল ব্যাংক আর্থিক সহায়তা পেলেও উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তিনি মনে করেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। তবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বল রয়েছে এবং কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, নির্বাচন শেষে কয়েক মাসের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি ফিরেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তবে আইএমএফ-সমর্থিত অর্থনৈতিক নীতিমালা বাস্তবায়ন, জ্বালানি সংকট সমাধান এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বিদ্যমান ট্যারিফ কাঠামো পর্যালোচনা এবং আসন্ন এলডিসি উত্তরণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, নতুন সরকার দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি নিশ্চিত করতে পারলে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে এবং কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে নতুন গতি সঞ্চারিত হবে।

