


দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন করে আশার সঞ্চার হলেও কাঙ্ক্ষিত গতিতে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিও থমকে আছে। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তবে আশার কথা, আর মাত্র এক মাস পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে—এমন প্রত্যাশা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
বিশেষ করে বেসরকারি খাতে নতুন করে উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা মনে করছেন, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তাঁদের আশা, যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম হবে। এর ফলে অর্থনীতির চাকা আবার ঘুরতে শুরু করবে।
স্থবিরতার মধ্যেও কিছু সূচকে স্বস্তি
সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার মধ্যেও অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতিশীলতার আভাস মিলছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ অর্থনীতির বড় ভরসা হয়ে উঠেছে। Bangladesh Bank-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো এক বছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সদ্য বিদায়ী বছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এই রেমিট্যান্সই ছিল সবচেয়ে বড় ভরসা। ডলারের বাজারে চাপ কমানো এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে এই বৈদেশিক মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনতে পারছে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মোট রিজার্ভ প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও Asian Clearing Union (আকু)-এর বিল পরিশোধের পর তা কমে বর্তমানে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা নিট রিজার্ভ এখন ২৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।
ডলার বাজারে স্বস্তি, তবে বিনিয়োগে শঙ্কা
ডলারের বাজারে আগের তুলনায় অস্থিরতা কমেছে। কার্ব মার্কেট ও ব্যাংক রেটের ব্যবধান সংকুচিত হওয়ায় আমদানিকারকদের জন্য এলসি খোলার খরচ কমছে। এতে কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য আমদানি কিছুটা সহজ হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রম কমে যাওয়ায় আমদানি হ্রাস পেয়েছে, যা রিজার্ভ বাড়ার পেছনে বড় কারণ। আপাতদৃষ্টিতে এটি ইতিবাচক হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ না হওয়া অর্থনীতির জন্য ভালো সংকেত নয়।
ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে আংশিক গতি
দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট ও আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে পুঁজিবাজারেও কিছুটা গতি ফিরতে শুরু করেছে। Dhaka Stock Exchange (ডিএসই)-তে সূচক ও লেনদেন উভয়ই বাড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিলছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার বাজার সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও জোরদার করবে।
পিএমআই সূচকে উন্নতি, তবু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
নির্বাচনকে ঘিরে ইতিবাচক মনোভাবের প্রভাব পড়েছে পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) সূচকেও। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ পিএমআই সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ দশমিক ২-এ, যা আগের মাসের তুলনায় সামান্য বেশি। এটি অর্থনীতির সামগ্রিক সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
খাতভিত্তিক হিসাবে কৃষি (৫৯.৬), উৎপাদন (৫৮.২) ও সেবা (৫১.৮) খাত প্রবৃদ্ধিতে থাকলেও নির্মাণ খাত (৪৯.৮) আবার সংকোচনের পথে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধি মূলত কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল, শিল্প ও নির্মাণ খাতে চাপ এখনো স্পষ্ট।
নির্বাচিত সরকারে বিনিয়োগের আশা
ব্যবসায়ীদের মতে, নির্বাচিত সরকার এলে বিনিয়োগে আস্থা ফেরার পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক সরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিকল্পনা নিতে পারে, যা বিনিয়োগ ঝুঁকি কমায়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থাকায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পায়। তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান M Masrur Riaz বলেন, জাতীয় নির্বাচনই এ বছরের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ভোগ বাড়বে, যা অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ইতিবাচক ইঙ্গিতের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। রপ্তানি খাতে স্থবিরতা কাটেনি। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বরে রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতিও বড় উদ্বেগের জায়গা। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতিরই প্রতিফলন।
আস্থাই মূল চাবিকাঠি
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আইন-শৃঙ্খলা, নীতিগত স্থিরতা ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া ইতিবাচক সূচকগুলো টেকসই হবে না। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যদি সরকার দ্রুত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে অর্থনীতিতে যে আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তা বাস্তব গতিতে রূপ নিতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।

