দৈনিক আশুলিয়া ডেস্ক
দেশের অর্থনীতির এক কঠিন সন্ধিক্ষণে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন—এমন প্রত্যাশা ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ব্যাংক খাতে অনিয়ম, উচ্চ খেলাপি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বেকারত্ব ও শিল্পখাতের মন্থর গতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা, নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই অর্থনীতির ‘ইঞ্জিন’ সচল করতে অগ্রাধিকার দেবে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক কাঠামো মেরামতই হবে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করছেন, বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটাতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অপ্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন বাড়িয়ে ব্যবসা শুরুর খরচ কমানো গেলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আইনি সুরক্ষা ও স্থিতিশীল নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও নতুন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা রয়েছে। বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকির প্রস্তাব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বিস্তারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিট পোশাক রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিকেএমইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, সুদের হার হ্রাস এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশেষ কৌশল গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার প্রথম ১০০ দিনের জন্য একটি ‘জরুরি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার রোডম্যাপ’ ঘোষণা করতে পারে। এতে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো, বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীল রাখা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে নতুন সরকারের প্রতি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—দ্রুত আস্থা পুনর্গঠন এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। এখন দেখার বিষয়, দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন নেতৃত্ব কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে নিয়ে যায়।

