নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জামদানি পল্লিতে বেড়েছে কর্মব্যস্ততা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁতে বসে জামদানি শাড়ি বুনতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁতিরা। ব্যবসায়ীদের আশা, এবারের ঈদ মৌসুমে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার জামদানি বিক্রি হবে। তবে বাজারে চাহিদা বাড়লেও কারিগরদের আয়ের চিত্র ততটা আশাব্যঞ্জক নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মসলিনের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত জামদানি শাড়ি বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে এর চাহিদা বেড়ে যায়। জামদানির জনপ্রিয় নকশার মধ্যে রয়েছে—পানা হাজার, তরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খি, বটপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, দুবলী, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার ও কলকাপাড়।
রূপগঞ্জের জামদানি পল্লিতে তৈরি এসব শাড়ি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের শোরুমে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এ ঐতিহ্যবাহী পণ্য।
তাঁতিরা জানান, প্রতিবছর ঈদের আগে কাজের চাপ বেড়ে যায়। বিভিন্ন নকশা ও ডিজাইনে জামদানি তৈরি করতে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হয় তাদের। জামদানি পল্লিতে প্রায় ৩০টি বিক্রয় শোরুম রয়েছে, যেখানে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা এসে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী জামদানি কিনে নিচ্ছেন।
আগে মূলত শাড়ি তৈরি হলেও এখন জামদানি কাপড়ে পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, টু-পিস ও শিশুদের পোশাকও তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে এই পেশার সঙ্গে প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতি জড়িত থাকলেও বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার তাঁতি কাজ করছেন। গত কয়েক বছরে প্রায় দেড় হাজার তাঁতি পেশা পরিবর্তন করেছেন।
তাঁতিরা জানান, পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দামের জামদানি শাড়ি তৈরি করা হয়। একটি শাড়ি তৈরি করতে ১৫ দিন থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগে। একটি শাড়ি তৈরির জন্য তাঁতিরা সাধারণত ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পান।
তাঁতি মালেক বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি জামদানি বুনছেন। সপ্তাহে তিন হাজার টাকা পান, যা মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরেক তাঁতি মোশারফ ও তার স্ত্রী মুক্তা বেগম জানান, তারা প্রায় ১৫ বছর ধরে জামদানি তৈরি করছেন। দুজন মিলে মাসে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা আয় করেন। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জামদানি পল্লীর ব্যবসায়ী মো. আ. মতিন বলেন, কয়েক বছর বাজার কিছুটা মন্দা থাকলেও বর্তমানে জামদানির বাজার আবার চাঙ্গা হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে অনলাইনে শাড়ির বিক্রিও বেড়েছে। ক্রেতারা অনলাইনে ডিজাইন দেখে অর্ডার দেন এবং পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে শাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁতিদের মজুরি খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। খরচ বাদ দিলে লাভের পরিমাণও খুব বেশি থাকে না।
জামদানি ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম কাশেম বলেন, দেশের জামদানি বিদেশেও বেশ সমাদৃত। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি রপ্তানি হচ্ছে এবং বিভিন্ন মেলায় অংশ নিয়ে এ ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে তুলে ধরা হচ্ছে।
রূপগঞ্জের বিসিক জামদানি পল্লীর শিল্পনগরী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, তাঁতিদের সহায়তার জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে এবার প্রায় ১৫০ কোটি টাকার জামদানি বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁতিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেও কাজ চলছে।
—নিজস্ব প্রতিবেদক

