নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক আশুলিয়া
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের দুশ্চিন্তার নাম এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে অস্থিরতা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ আজ কার্যত জিম্মি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বাজার ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি। বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
ডিম, মুরগি, পেঁয়াজ, সবজি, তেল, চিনি—কোনো পণ্যই মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বাজারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ডিম ও পেঁয়াজের দাম সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিন্ডিকেটই মূল সমস্যা
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ সিন্ডিকেট। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজেদের মতো করে দাম বাড়িয়ে দেয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে থাকা ফড়িয়া ও আড়তদাররা লাভের বড় অংশ কুক্ষিগত করছে। কৃষিপণ্যের লাভের প্রায় ৮০ শতাংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে—এমন তথ্য দিয়েছে খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয়।
চাল, পেঁয়াজ, আলু, চিনি—যে পণ্যই ধরা হোক না কেন, বাজারে একই চিত্র। সরকার পণ্যদামের তালিকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণে যেসব সংস্থা রয়েছে, তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
রমজান সামনে, বাড়ছে উদ্বেগ
রমজান মাস সামনে রেখে বাজারে ইতোমধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সবজির দাম বেড়েছে হঠাৎ করেই। কাঁচা মরিচ কেজি ১২০ টাকা, শসা ১১০–১২০ টাকা, টমেটো ৯০–১০০ টাকা, ফুলকপি ও শিমের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
মুরগির বাজারেও একই অবস্থা। ব্রয়লার, দেশি ও পাকিস্তানি মুরগির দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ১০–২০ টাকা বেড়েছে। রমজানে প্রোটিনের চাহিদা বাড়ে—এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভোক্তারা।
পাইকারি বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ দেশের বড় পাইকারি বাজারগুলোতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে প্রতিনিয়ত। গত এক সপ্তাহে—
-
দেশি পেঁয়াজ বেড়ে কেজিতে ৩৫–৪০ টাকা
-
ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০–৬৫ টাকা
-
রসুন ১৩০ টাকা
-
আদা ১১০–১১৫ টাকা
-
ছোলা ৭০–৭৫ টাকা
-
চিনি প্রতি মণ ৩,৫০০ টাকা
-
পাম তেল ৫,৯৯০ টাকা
-
সেমাই ১,৯৫০–২,০০০ টাকা
এই ঊর্ধ্বগতির বড় কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের জট। বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে শতাধিক জাহাজ আটকে আছে। প্রায় ৪৫ লাখ টন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি জাহাজে রয়েছে রমজানের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য।
লাইটার জাহাজ সংকট ও সিন্ডিকেট
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লাইটার জাহাজ সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম জাহাজ সরবরাহ করা হচ্ছে। এখানেও সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য খালাসে বিলম্ব ঘটিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। কারণ, প্রায় প্রতিটি সরকার আমলেই এই চক্র ক্ষমতার আশ্রয়ে সক্রিয় থাকে।
কী করণীয়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
-
মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমাতে কৃষক–ভোক্তা সরাসরি সংযোগ বাড়াতে হবে
-
বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে
-
মজুতদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে
-
বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি
-
রমজানকে সামনে রেখে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন প্রয়োজন
নইলে সামনে রমজান ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাজার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
শেষ কথা
নিত্যপণ্যের বাজার এখন আর অর্থনীতির নিয়মে চলে না—চলে সিন্ডিকেটের ইচ্ছায়। যতদিন না এই সিন্ডিকেট ভাঙা যাচ্ছে, ততদিন সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরবে না। রমজান সামনে রেখে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে জনদুর্ভোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে—এ বিষয়ে এখনই সরকারের দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

