দৈনিক আশুলিয়া
প্রকাশ: বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ গাইডলাইন হলো পবিত্র আল কোরআন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি প্রথম যে ওহি নাজিল হয়, তাতে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। হেরা পর্বতে ধ্যানে মগ্ন অবস্থায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবী (সা.)-এর কাছে যে প্রথম আয়াতগুলো পৌঁছে দেন, তা ছিল—“পড়, তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক মহা সম্মানিত, যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানত না।” (সুরা আলাক: ১-৫)
কোরআনের এই প্রথম নির্দেশনাই প্রমাণ করে, ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী (সা.) নিজে অক্ষরজ্ঞানহীন হলেও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহির মাধ্যমে তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন। তাঁর জীবন ও শিক্ষা মুসলিম উম্মাহকে জ্ঞান অর্জন এবং সৎপথে চলার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী প্রত্যেক মুমিনের জন্য জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য কর্তব্য। কারণ পবিত্র কোরআন মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে জাগতিক ও পারলৌকিক জীবনের সফলতার নির্দেশনা রয়েছে। তাই জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা উদাসীনতার সুযোগ নেই।
ইসলাম শুধু নিজে জ্ঞান অর্জনের ওপরই গুরুত্ব দেয়নি, বরং পরবর্তী প্রজন্মকেও সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার নির্দেশ দিয়েছে। সন্তানদের কোরআন-হাদিসের জ্ঞান প্রদান, নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জীবিকা নির্বাহের উপযোগী শিক্ষা অর্জনে সহায়তা করা অভিভাবকদের দায়িত্ব। মহানবী (সা.) স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং অপরের কাছে হাত পাতাকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সেই জাতি তত বেশি উন্নত। শিক্ষা মানুষকে অজ্ঞতা ও অন্ধকার থেকে মুক্ত করে কল্যাণ, ন্যায় এবং সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, “তিনিই সেই সত্তা, যিনি নিরক্ষরদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসুল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের তাঁর আয়াত তেলাওয়াত করে শোনান, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন।” (সুরা জুমু’আ: ২)
ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রখ্যাত মনীষী হজরত হিশাম ইবনি উরওয়াহ (রহ.) বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা সন্তানদের ইলম অর্জনের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলতেন, “তোমরা জ্ঞান অর্জন কর, কারণ আজ তোমরা ছোট হলেও ভবিষ্যতে তোমরাই জাতির নেতৃত্ব দেবে।” (সুনানে দারিমি)
একইভাবে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.) তাঁর সন্তান ও ভাতিজাদের জ্ঞান অর্জনের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেন, “তোমরা ইলম শিক্ষা কর। যদি মুখস্থ রাখতে না পারো, তবে তা লিখে সংরক্ষণ কর।” (সুনানে দারিমি)
এসব নির্দেশনা প্রমাণ করে, ইসলাম জ্ঞান অর্জন এবং শিক্ষার প্রসারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। মানবতার মুক্তির মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রথম শব্দই যখন ‘পড়’, তখন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই একটি আলোকিত, নৈতিক ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে জ্ঞানচর্চা ও সুশিক্ষার বিস্তার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

